'আহমদ ছফা' নামটির সাথে পরিচয় হই শেরপুর গণগ্রন্থাগারে। সেখানে আমি তার "গাভী বিত্তান্ত" উপন্যাসটি পাঠ করি। তিনি ছিলেন একজন কবি,ঔপন্যাসিক,চিন্তাবিদ। 
গাভী বিত্তান্ত পড়ার পর থেকেই তার লেখার প্রতি একটা প্রবল ঝোঁক কাজ করে।এরপর পড়া হয় "যদ্যপি আমার গুরু","এক জন আলী কেনানের উত্থান-পতন","সূর্য তুমি সাথী","বাঙালী মুসলমানের মন"
এছাড়াও কবি হুইসেল হোসেনের কাছ থেকে তার রচনাসমগ্র ধার নিয়ে পড়ে শেষ করি আহমদ ছফার ডায়েরি আর তার কাব্যগ্রন্থ "একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা"। বন্ধুর মারফতে যোগাড় করে পড়ি তার সাক্ষাৎকার সমগ্র। 
তিনি ছিলেন স্পষ্টবাদী মানুষ,তার ব্যক্তিত্ববোধ আমাকে মুগ্ধ করেছে বার বার।
তিনি এক সাক্ষাতকারে নিজের ব্যপারে বলেছেন,"খুব দুর্বিনীত ছিলাম,খুব দুর্বিনীত।আজকে আমি একজনকেও দেখি না আমার মতো।আবার ব্রাত্য রাইসু যখন একটু উস্কানি দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন,"ছফা ভাই আপনি সমকালীন কারোরই প্রশংসা করেন না,কেন করেন না?তিনি নির্মলভাবে উত্তর দেন,"করি,আমার নিজের।" এক লেখক কতোটা আত্মবিশ্বাসী হলে নিজের লেখার প্রশংসা নিজে করতে পারেন!আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি তার ছিলো প্রবল ক্রোধ,তিনি তার শিক্ষকদেরও তার কথা দ্বারা সরাসরি আক্রমণ করে বসতেন, তিনি তার সাক্ষাতকারে নিজেই বলেছেন তিনি ক্রোধ ছাড়া বাইরে আর কোন অনুভূতিই তেমনভাবে প্রকাশ করেন না। 
" তিনি কেন বিয়ে করেন নি,সেই প্রশ্নের উত্তরে বলতেন "আমার তো ইতিহাসের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে"। সাজ্জাদ শরীফ যখন তাকে প্রশ্ন করেন " আপনি মেয়েদের মধ্যে কি চান,সেটা বলেন।আপনার বান্ধবীদের কাছ থেকে?"
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন,"আমি মেয়েদের মধ্যে দুটো জিনিস চাই। একটা হচ্ছে স্থিরতা,আরেক'টা হচ্ছে সহজতা।"
ব্রাত্য রাইসু তাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন,"আপনারলেখালেখিতে কোন সেক্স নাই ছফা ভাই?আপনি এড়িয়ে যান?
তিনি বলেন,এড়াবো কেন?সেক্স তো সুন্দর জিনিস,সুন্দরভাবে তুলে আনতে চাই। যদি কেউ চ্যালেঞ্জ করে আমি একটা পর্ণোগ্রাফি লিখে দিতে পারি। কিন্তু লিখবো কেন,আমি এত ভালো লিখি। তিনিই বরং উল্টো প্রশ্ন করে বসেন,
সাহিত্যের মধ্যে যদি আসে তো আসুক,সেটা আনার জন্য সাহিত্য করতে হবে কেন? 
মীজানুর রহমান মিজান নামে একজন একবার তাকে সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করেছিলো," আপনি কি মনে করেন কোন সাহিত্যিকের জন্য মৃত্তিকার গহিন স্পর্শ অপরিহার্য?" 
তিনি উত্তর দেন,"যে কোন মানুষ, শুধু সাহিত্যিক নয়, তাকে শেকড়ের দিকে যেতে হয়। শেকড়চ্যুত রাজনীতি বলুন,সাহিত্য বলুন, অর্থনীতি বলুন সবটাই অর্থহীনতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। 
তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়,তরুণ সাহিত্যিকদের করণীয় কি?
তিনি উত্তর দেন,"প্রথমত করণীয় সৎ হওয়া,দ্বিতীয়ত করণীয় সৎ হওয়া,তৃতীয়ত করনীয় সৎ হওয়া।" 
তাকে আরেকটি সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়,ইসলামের নবীকে আরবে অস্ত্র ধরতে হয়েছে, কিন্তু এখানে তার অনুসারীদের এটা করতে হয় নি। এটা কি কারণে হলো? 
তিনি বলেন," এই কথাটি সর্বাংশে ঠিক নয়। হযরত শাহজালাল,খান জাহান আলী অনেকেই অস্ত্রের ব্যবহার করেছেন।কিন্তু শান্তিপূর্ণ প্রচারের কারণেই এখানে অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাছাড়া একেক'টা সংস্কৃতির একেক'টা আলাদা চরিত্র থাকে।আমার ধারণা মোহাম্মদ যদি বাংলায় জন্মগ্রহণ করতেন তবে শ্রীচৈতন্যের মত সংকীর্তন করে ধর্মপ্রচার করতেন।আর শ্রীচৈতন্য যদি আরবে জন্ম নিতেন,তবে তাকেও হয়তো অস্ত্র ধারণ করতে হতো। "
আবার ব্রাত্য রাইসু যখন তাকে প্রশ্ন করেন,"হিন্দুরা সব সময় ইন্ডিয়াতে কেন যায়?" 
তিনি বলেন,"যাওয়ার জায়গা আছে বলেই যায়,পাকিস্থান থাকলে আমরাও যেতাম। ওদের কেউ না কেউ আছে ইন্ডিয়ায়। এটার একটা ঐতিহাসিক রিজন আছে,সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না।যেমন বেশির ভাগ মুসলমানেরা সৌদিআরব যায়। ওখানে ওদের তীর্থক্ষেত্রগুলো আছে,ছেলে-মেয়েদের বিয়ে-শাদী আছে। হিন্দু মুসলমানের প্রসঙ্গটা এখানে আনা ঠিক হবে না।" 
তিনি বলতেন সেক্যুলারিজম আমাদের সমাজের মধ্যেও বিকশিত করে তুলতে হবে। ধর্ম বিশ্বাসটাকে গোপন প্রিয় অসুখের মত লালন করা এবং প্রকাশ্য অস্বীকার করা,এটা এক ধরণের সাহিত্যিক পাপ।"
তিনি তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন আমি কিছুদিন হাফেজ্জী হুজুরের কাছে ঘোরাঘুরি করেছি,তখন অনেকে আমার সমালোচনা করেছে।কিন্তু আমি যখন রামকৃষ্ণ মিশনে সময় কাটাতাম বা খ্রিষ্টান পাদ্রীদের কাছে যেতাম তখন কেউ সমালোচনা করে নি।

আজ তার প্রয়াণদিবসে তাঁর স্মৃতিচারণায় আমি এতোটুকু আপনাদের জানাতে পারছি। অতি প্রিয় এই সাহিত্যিকের প্রতি এই আমার নিবেদন ক্ষুদ্র, তার কিছু উক্তি আপনাদের জন্য তুলে ধরছি :

*
লোকে যাই বলুক, যাই অনুভব করুক, নিজের কাছে আমি অনন্য।
*
সরলতা এবং সততাই আমার মূলধন।

*
নারীরা নারীই, সঙ্গের সাথী, দুঃখের বন্ধু এবং আদর্শের অনুসারী নয়।

*
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারো রচনায় আমার মন বসে না।

*
মানুষের শরীরে যেমন টিউমার থাকে, পণ্ডিতেরাও তেমনি সামাজিক টিউমার। প্রকৃতির গভীর গোপন রহস্য এরা বোঝে না। এরা বিশ্বাস করে ছাপার অক্ষরের প্রমাণ।

*
মানুষ যে সমস্ত কথা বলে, ইতিহাসের কাছে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য সজ্ঞানভাবে লিখে যায়, ও সমস্ত প্রয়াসের মধ্যে একটা কপটতা রয়েছে।
*
মাথায় খুস্কি, চোখের নিচে কালো দাগ এবং দাঁতের ব্যথা এ তিনটি যেনো আমি সাহিত্য, সঙ্গীত এবং রাজনীতির কাছে থেকে পেয়েছি।

*
বোকা লোকেরা বোকামীতে ভয়ানক চালাক। তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বোকামীকে টিকিয়ে রাখতে চায়।

*
বাঁধনহীন মানুষের অনেক বাঁধন।

*
মাজারে মানুষ আসবেই। মানুষ আসবে কারণ সে দুর্বল অসহায় এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী।

*
সম্যক পরিচয়ের অভাবই হচ্ছে মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষের মূল।

*
একটি কাক আরেকটি কাকের মুখের খাবার কেড়ে নেয়ার জন্য যতরকম ধূর্ততার আশ্রয় নিয়ে থাকে, একজন কবি আরেকজন কবির প্রাপ্য সম্মানটুকু কেড়ে নেয়ার জন্য তাঁর চাইতে কিছু কম করে না।

*
বাঙালি মুসলমানের মন যে এখনও আদিম অবস্থায়, তা বাঙালি হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুণ তাঁর মনের উপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত রয়েছে, সজ্ঞানে তাঁর বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে।

*
প্রতিটি রাষ্ট্র নিজস্ব প্রয়োজনে ইতিহাসকে বিকৃত করে।

*
রাষ্ট্র যা শিক্ষা দেয় তাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মিথ্যার মিশাল থাকেই; এই মিথ্যা মারাত্মক, মানুষের মনোবৃত্তিকে বিষিয়ে তোলার ক্ষমতা এর অপরিসীম।

*
বস্তুত একজন বিশ্বাসী মানুষ ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে যে ধরনের নির্মল আনন্দ অনুভব করেন, একজন ধর্মবিশ্বাসহীন মানুষ উন্নত সাহিত্য পাঠেও একই আনন্দ পেয়ে থাকেন।

*
সভ্যতা কোন দেশ জাতি বা সম্প্রদায় বিশেষের সম্পত্তি নয়— অথচ প্রতিটি তথাকথিত সুসভ্য জাতির মধ্যেই এই সভ্য অভিমান প্রচন্ডভাবে লক্ষ্য করা যায়।